দোলকের পথচলা
দোলক শুধু একটি সাহিত্যপত্রিকার নাম নয়—এটি একটি সময়ের স্মৃতি, কিছু তরুণ মানুষের স্বপ্ন, এবং বাংলা সাহিত্যের ভেতরে নতুনভাবে ভাবার একটি সাহসী প্রয়াসের নাম। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে দোলকের যাত্রা শুরু হয়। সেই সময় বাংলাদেশে ছোট কাগজ ও সাহিত্যপত্রিকার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য থাকলেও দোলক শুরু থেকেই নিজেকে একটু আলাদাভাবে ভাবতে চেয়েছিল। আমাদের বিশ্বাস ছিল সাহিত্যকে কেবল সীমিত পাঠকের ভেতরে আটকে রাখার প্রয়োজন নেই—সাহিত্য একই সঙ্গে রুচিশীল, আধুনিক এবং বৃহত্তর পাঠকের কাছেও আকর্ষণীয় হতে পারে।
সেই ভাবনা থেকেই দোলক প্রকাশিত হয়েছিল চকচকে গ্লসি কাগজে। বাংলাদেশে সাহিত্যপত্রিকার ক্ষেত্রে এটি ছিল একেবারেই নতুন উদ্যোগ। দোলকই ছিল বাংলাদেশের প্রথম গ্লসি পেপারে ছাপা সাহিত্যপত্রিকা। তখন অনেকে বিস্মিত হয়েছেন, কেউ কেউ সন্দেহও করেছিলেন—সাহিত্যপত্রিকা কি এভাবে করা সম্ভব? কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দোলক প্রমাণ করে যে সাহিত্যকে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি সাহিত্যপত্রিকা একই সঙ্গে সৌন্দর্য, গুণমান ও পাঠযোগ্যতার জায়গা তৈরি করতে পারে।
দোলক ছিল মাসিক সাহিত্যপত্রিকা। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে, যদিও মাঝে কিছু অনিবার্য বিরতি ছিল। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যাই আমরা চেষ্টা করেছি যত্ন নিয়ে তৈরি করতে। প্রতিটি প্রচ্ছদ, প্রতিটি লেখা, প্রতিটি ডিজাইন—সবকিছুতেই ছিল আলাদা মনোযোগ। আমরা চাইতাম, পাঠক যখন দোলক হাতে নেবেন, তখন যেন শুধু লেখা পড়ার অভিজ্ঞতাই না হয়, পুরো পত্রিকাটিই যেন একটি শিল্পবস্তু হয়ে ওঠে।
দোলকের সম্পাদক আমিনা শেলী। শুরু থেকেই তিনি এই পত্রিকার মূল স্বপ্ন ও ভাবনাকে ধারণ করেছেন। তার সম্পাদনায় দোলক খুব দ্রুত একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে সক্ষম হয়। প্রথম কয়েকটি সংখ্যায় সহযোগী সম্পাদক হিসাবে ছিলেন সানাউল্লাহ সাগর। পরবর্তী সংখ্যাগুলোতে সহযোগী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন গালিব রহমান। তাদের প্রত্যেকের শ্রম, সাহিত্যবোধ ও আন্তরিকতা দোলকের পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দোলক সবসময় নতুন ও বৈচিত্র্যময় লেখাকে গুরুত্ব দিয়েছে। কবিতা, অনুবাদ-কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, ফিচার, ব্যক্তিগত গদ্য—বিভিন্ন ধরনের মৌলিক লেখা আমরা প্রকাশ করেছি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশে নতুন লেখকদেরও সমান গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমাদের বিশ্বাস ছিল, সাহিত্য কেবল পরিচিত নামের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলে তার প্রাণশক্তি কমে যায়। নতুন লেখকদের জায়গা করে দেওয়াই একটি সাহিত্যপত্রিকার অন্যতম দায়িত্ব।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দোলক লেখক ও পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লেখা আসতে শুরু করে। তরুণ লেখকেরা দোলকে তাদের লেখার জন্য একটি আন্তরিক জায়গা হিসাবে দেখতে শুরু করেন। আবার নিয়মিত পাঠকেরাও অপেক্ষা করতেন নতুন সংখ্যার জন্য। সাহিত্যপত্রিকা হয়েও দোলক যে পরিমাণ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল, সেটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে আনন্দের এবং আশাব্যঞ্জক ছিল।
তবে একটি স্বপ্নকে টিকিয়ে রাখতে শুধু শ্রম ও ভালোবাসা যথেষ্ট হয় না, প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্থিতিও। গ্লসি কাগজে একটি মাসিক সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ করা ছিল ব্যয়বহুল কাজ। শুরু থেকেই আমরা নানা সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়ে কাজ করেছি। শেষ পর্যন্ত অর্থসংকটের কারণেই দোলকের নিয়মিত প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৬ সালের নভেম্বরের পর পত্রিকাটি আর প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ডিসেম্বর সংখ্যা পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার পরেও ছাপায় উঠতে পারেনি যা ছিল কষ্টের।
কিন্তু দোলক কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
পত্রিকাটি বন্ধ থাকলেও দোলকের দল ভেঙে যায়নি। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে আমরা বারবার চেষ্টা করেছি দোলককে তার আগের গৌরবময় রূপে ফিরিয়ে আনার। নানা পরিকল্পনা হয়েছে, অসংখ্য আলোচনা হয়েছে, অনেক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার কারণে সেসব প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তবুও দোলকের স্বপ্ন কখনো থেমে থাকেনি। কারণ দোলক আমাদের কাছে কেবল একটি প্রকাশনা নয়, এটি এক ধরনের বিশ্বাস।
আমরা বিশ্বাস করি, ভালো সাহিত্যপত্রিকার এখনও প্রয়োজন আছে। এখনও এমন পাঠক আছেন, যারা নতুন কবিতা পড়তে চান, নতুন গল্প খুঁজে নিতে চান, নতুন চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হতে চান। এখনও এমন লেখক আছেন, যারা আন্তরিকভাবে লিখে যাচ্ছেন এবং একটি সম্মানজনক সাহিত্য-পরিসর খুঁজছেন। দোলক সেই জায়গাটিই আবার তৈরি করতে চায়।
এই দীর্ঘ বিরতির পর আবারও দোলক ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সময় বদলেছে, বাস্তবতা বদলেছে, পাঠকের অভ্যাসও বদলেছে—কিন্তু সাহিত্য ও ভাষার প্রতি ভালোবাসা বদলায়নি। বরং হয়তো আগের চেয়েও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে এমন একটি জায়গা, যেখানে নতুন ও স্বাধীন সাহিত্যচর্চা সম্ভব।
দোলকের পথচলা তাই কেবল অতীতের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে স্মৃতি, সংগ্রাম, বিরতি এবং ফিরে আসার গল্প। আমরা জানি, পথ সহজ নয়। কিন্তু আমরা এটাও জানি—কিছু স্বপ্ন সময়ের কাছে হার মানে না।
দোলক সেই স্বপ্নগুলোরই একটি।